2017 Malda flood relief: মালদা বন্যা ত্রাণে ১০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি, ফের তৃণমূলের দুর্নীতির পর্দা ফাঁস ক্যাগ রিপোর্টে
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: আবারও দুর্নীতির অভিযোগ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালের আগস্টে মালদার ভয়াবহ বন্যার পর ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণের নামে যে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, তার বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে প্রায় ৭০০ পাতার কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)-এর রিপোর্টে। এই রিপোর্ট সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে জমা পড়েছে।
সিএজি-র প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত মিলেছে, বন্যা ত্রাণের নামে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লুট হয়েছে। রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে—এটি নিছক প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং একটি সংগঠিত ও পরিকল্পিত দুর্নীতির চিত্র, যেখানে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত হয়েছেন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা লাভবান হয়েছেন।
ডুপ্লিকেট অ্যাকাউন্টে একাধিকবার টাকা, একই ব্যক্তি পেল ৪২ বার ক্ষতিপূরণ
রিপোর্টের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশে উঠে এসেছে ডুপ্লিকেট ও একাধিকবার অর্থপ্রদানের তথ্য। একই নাম, একই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং একই IFSC কোডে ২ বার থেকে সর্বোচ্চ ৪২ বার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়েছে।
হরিশ্চন্দ্রপুর–২ ব্লকে এক ব্যক্তি একই বাড়ির ক্ষতির জন্য ৪২ বার ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন বলে সিএজি জানিয়েছে। এই ধরনের ভুয়ো ও বহুগুণ অর্থপ্রদানের মাধ্যমে ৫.৯০ কোটি টাকা নয়ছয় হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৬,৯৬৫ জন উপভোক্তার ক্ষেত্রে একই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একাধিকবার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।
পাকা বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা, অথচ সরকারি নথিতে শূন্য ক্ষতি
সিএজি রিপোর্টে উল্লেখ, মালদা জেলায় ১,৬০৯টি পাকা বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত দেখিয়ে ৭.৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়। অথচ তৎকালীন জেলাশাসক (DM) সরকারি নথিতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—২০১৭ সালের বন্যায় একটিও পাকা বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এছাড়া, ক্ষয়ক্ষতি যাচাই না করেই গোটা জেলায় ৭.২৯ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি।
তালিকায় নাম নেই, আবেদনও নয়—তবু কোটি কোটি টাকা বণ্টন
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৭ কোটি টাকা এমন ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে, যাঁদের নাম সরকারি ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় ছিল না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কোনও আবেদনই জমা পড়েনি।
- রাতুয়া–১ ব্লকে এই ধরনের অনিয়মে ২.৬০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
- বিপিএল ত্রাণে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মীদের নাম
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, ১০৮ জন জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মচারী বেআইনিভাবে বিপিএল (Below Poverty Line) ত্রাণের টাকা নিয়েছেন।
এর মধ্যে—
- ৩৬ জন পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য পেয়েছেন মোট ২৬ লক্ষ টাকা
- হরিশ্চন্দ্রপুর–২ ব্লকের ৪ জন সরকারি কর্মী নিয়েছেন ৫.২৮ লক্ষ টাকা
সিএজি স্পষ্ট জানিয়েছে, এদের কেউই বিপিএল বা বন্যা-আক্রান্ত হওয়ার যোগ্য ছিলেন না।
নিয়ম ভেঙে ত্রাণ, অডিটে ‘হারিয়ে’ গেল নথি
নিয়ম অনুযায়ী, চার সদস্যের যাচাই কমিটির অনুমোদন ছাড়া ত্রাণ দেওয়া যায় না। কিন্তু মানিকচক, ওল্ড মালদা, ইংরেজবাজার, কালিয়াচক–১ এবং রাতুয়া–১ ব্লকে এই নিয়ম মানা হয়নি।
ওল্ড মালদা ব্লকে অডিট চলাকালীন গুরুত্বপূর্ণ নথি “হারিয়ে গিয়েছে” বলে দাবি করা হয়। তবে এই নথি হারানোর বিষয়ে কোনও পুলিশি অভিযোগ দায়ের হয়নি।
৮০-র বেশি পঞ্চায়েত প্রধান ও আধিকারিকের নাম জড়িত
প্রকাশিত প্রাথমিক সিএজি রিপোর্টে ৮০-এর বেশি পঞ্চায়েত প্রধান ও কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। অভিযোগ, এদের অনেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত। কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলাগুলিতে দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দায়িত্বে থাকা অন্তত ৩০ জন বিডিও এই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
একজন বন্যা-ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা আজও ঘর তুলতে পারিনি। কিন্তু শুনছি আমাদের নামে টাকা উঠেছে। সেই টাকা কোথায় গেল, আমরা জানি না।”
আদালতের কড়া মন্তব্য
এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি বেঞ্চ মন্তব্য করেছে, “এটা শুধু অর্থের অপব্যবহার নয়, এটা মানুষের জীবনের সঙ্গে খেলা। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা আজও ত্রাণের অপেক্ষায়।”
ত্রাণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
আমফান ঝড়, কোভিড ত্রাণের পর মালদা বন্যা ত্রাণ কেলেঙ্কারি ফের রাজ্যের দুর্যোগ মোকাবিলা ও ত্রাণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে ‘বঞ্চনা’-র কথা বলেন, সিএজি রিপোর্ট সেখানে ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই বঞ্চনা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেই পরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠছে, এটাই কি তৃণমূল কংগ্রেসের ত্রাণ বিতরণ মডেল—যেখানে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা শূন্য হাতে ফেরে, আর কোটি কোটি টাকা চলে যায় র্যান্ডম ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে?
তথ্যসূত্র: মানিকন্ট্রোল


