India-Germany submarine deal: জার্মানির সঙ্গে ৭২ হাজার কোটি টাকার নেক্সট জেনারেশন সাবমেরিন চুক্তি করছে ভারত
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ভারতের নৌসেনা ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা–শিল্প চুক্তি চূড়ান্ত করতে চলেছে নয়াদিল্লি ও বার্লিন। জার্মান সাবমেরিন নির্মাতা সংস্থা থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS)–এর সঙ্গে মাঝগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (MDL)–এর অংশীদারিত্বে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য নির্মিত হবে ৬টি অত্যাধুনিক কনভেনশনাল সাবমেরিন। বহু প্রতীক্ষিত প্রজেক্ট–৭৫আই (Project-75I)–এর অধীনে এই চুক্তির আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকা)।
১২–১৩ জানুয়ারি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস–এর ভারত সফরের সময়েই এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা সূত্রের খবর।
টাইপ–২১৪ এনজি: ভারতীয় নৌবাহিনীর পছন্দের কারণ কী?
প্রজেক্ট–৭৫আই–এর অধীনে ভারতীয় নৌবাহিনী বেছে নিয়েছে জার্মানির টাইপ–২১৪ নেক্সট জেনারেশন (214NG) সাবমেরিন—একটি প্রায় ২,৫০০ টন ওজনের ডিজেল–ইলেকট্রিক প্ল্যাটফর্ম, যা উন্নত এয়ার–ইন্ডিপেনডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তিতে সজ্জিত।
স্পেনের এস–৮০ প্লাস সাবমেরিনকে পিছনে ফেলেছে জার্মান মডেলটি। এতে রয়েছে-
যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য ফুয়েল-সেল ভিত্তিক AIP সিস্টেম,
উন্নত অ্যাকুস্টিক স্টেলথ,
এবং তুলনামূলকভাবে কম লাইফ–সাইকেল ঝুঁকি।
সাধারণ ডিজেল সাবমেরিনকে ব্যাটারি চার্জ করতে মাঝেমধ্যেই ভেসে উঠতে হয়, যা শত্রুপক্ষের নজরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। সেখানে AIP–যুক্ত সাবমেরিন টানা কয়েক সপ্তাহ পানির নিচে থেকেই নজরদারি ও আঘাত হানতে সক্ষম- নিঃশব্দ , অদৃশ্য এবং প্রাণঘাতী।
১৯৭১ থেকে ২০২৫: ইতিহাসের শিক্ষা ও আধুনিক প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের ভারত–পাক যুদ্ধ–এ অপারেশন ট্রাইডেন্ট ও অপারেশন পাইথন–এর মাধ্যমে করাচি বন্দরে ভারতের নৌ হামলা পাকিস্তানের নৌব্যবস্থা ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংস করে দেয়। সেই আঘাত যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবুও পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ভারতের সাবমেরিন আধুনিকীকরণে গতি ছিল ধীর। প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, নীতিগত জটিলতা ও বিলম্বে নৌবাহিনীর আন্ডারওয়াটার ফ্লিট ক্রমে পুরনো হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতা ফের সামনে আসে মে ২০২৫–এর ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালীন। সন্ত্রাসমূলক উসকানির পর ভারত–পাক উত্তেজনা বাড়লে ভারতীয় নৌবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে। প্রতিরক্ষা মহলে তখন স্পষ্ট বার্তা, প্রয়োজনে আবারও করাচি বন্দর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
পাকিস্তানের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের মেরুদণ্ড করাচি। করাচি বন্দরে আঘাত হানার ক্ষমতা যে ভারতের হাতে রয়েছে এই ধারণাই কার্যত কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করে।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও আত্মনির্ভরতার দিক
এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক, ছ’টি সাবমেরিনই ভারতে নির্মিত হবে। মূল নির্মাণ সংস্থা থাকবে MDL, আর TKMS দেবে নকশা, প্রযুক্তি সহায়তা ও ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা।
প্রথম সাবমেরিনে প্রায় ৪৫ শতাংশ দেশীয় উপাদান, যা শেষটির ক্ষেত্রে বেড়ে দাঁড়াবে ৬০ শতাংশে। এটি সরাসরি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডে বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভরতা কমাবে।
এর আগে প্রজেক্ট–৭৫–এর অধীনে স্করপেন শ্রেণির সাবমেরিন নির্মাণের অভিজ্ঞতা MDL–কে এই প্রকল্পের জন্য সবচেয়ে যোগ্য করে তুলেছে।
চিন–পাক চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত গুরুত্ব
বর্তমানে ভারত মহাসাগরে চিনের সাবমেরিন তৎপরতা দ্রুত বাড়ছে। চিনা নৌবাহিনীর সাবমেরিন একাধিক আঞ্চলিক বন্দরে ভিড়েছে, টহল দিয়েছে ভারতের নিকটবর্তী জলসীমায়। অন্যদিকে, চিনের সহায়তায় পাকিস্তানও নিজের সাবমেরিন বহর আধুনিক করছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রজেক্ট–৭৫আই ভারতের জন্য শুধুমাত্র আধুনিকীকরণ নয়, বরং আন্ডারসি ডিটারেন্স পুনর্গঠনের কৌশলগত প্রয়োজন।
আরো শক্তিশালী হবে ভারতীয় নৌসেনা
টাইপ–২১৪ এনজি সাবমেরিন যুক্ত হলে ভারতীয় নৌবাহিনীর নজরদারি, সি–ডিনায়াল ও নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে। পাশাপাশি, সাবমেরিন নির্মাণে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ দেশীয় প্রকল্পের পথ প্রশস্ত হবে।


