Friday, January 30, 2026
Latestদেশ

India-EU FTA: ‘মাদার অফ অল ডিলস’, ভারত- ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করবে

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: প্রায় ২০ বছরের দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement) সই করল ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। উভয় পক্ষই এই চুক্তিকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বলে অভিহিত করেছে। মঙ্গলবার ঘোষিত এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ একটি অভিন্ন মুক্ত-বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় আসছেন।

এই চুক্তির আওতায় ভারত ও ২৭টি ইউরোপীয় দেশের জোট ইইউ মিলিয়ে প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশের সমান।

প্রজাতন্ত্র দিবসে কূটনৈতিক বার্তা

চুক্তির প্রাক্কালে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে সম্মানিত অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এই উপস্থিতিকে ভারত–ইইউ সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভূ-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার আবহেই এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ভারত ও ইইউ—দু’পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে।

কী বললেন মোদী ও ভন ডার লেন

ভারত–ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের আগে একটি জ্বালানি সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, “এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের মানুষের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। এটি উৎপাদনের পাশাপাশি পরিষেবা খাতেরও প্রসার ঘটাবে।”

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ উরসুলা ভন ডার লেন লেখেন, “ইউরোপ ও ভারত আজ ইতিহাস তৈরি করল। ২০০ কোটি মানুষের জন্য একটি মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠল।”

চুক্তির মূল দিকগুলি

  • এটি ভারতের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি
  • পণ্য, পরিষেবা ও বিনিয়োগ—তিন ক্ষেত্রই এর আওতায়
  • ইইউ ভারতের জন্য ১৪৪টি পরিষেবা উপখাত খুলে দিচ্ছে
  • ভারত ইইউ-এর জন্য ১০২টি পরিষেবা উপখাত উন্মুক্ত করবে

২০২৩ সালে ইইউ ‘জেনারালাইজড স্কিম অব প্রিফারেন্সেস’ (GSP) সুবিধা প্রত্যাহার করায় ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা চাপে পড়েছিলেন। নতুন চুক্তিতে সেই ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

কোন খাতে লাভ ভারতের

ইইউ ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক তুলে নেবে। ৭ বছরের মধ্যে এই সুবিধা ৯৩ শতাংশে পৌঁছবে।

বিশেষ সুবিধা পাবে—

বস্ত্র ও পোশাক

ওষুধ ও রাসায়নিক

রত্ন ও অলংকার

চামড়া ও জুতা

চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ

ইস্পাত রপ্তানির ক্ষেত্রে কোটা নিয়ে আলোচনা চললেও আপাতত ভারত ১৬ লাখ টন ইস্পাত শুল্কমুক্তভাবে ইইউতে রপ্তানি করতে পারবে।

অটোমোবাইল খাতে বড় পরিবর্তন

দীর্ঘদিন ধরে অটোমোবাইল খাত নিয়েই ভারত–ইইউ আলোচনা আটকে ছিল। নতুন চুক্তি অনুযায়ী,

ইইউ থেকে আমদানিকৃত গাড়ির শুল্ক ধাপে ধাপে ১০ শতাংশে নামানো হবে

তবে ১৫ হাজার ইউরোর কম দামের গাড়ি চুক্তির বাইরে থাকবে

দেশীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্প রক্ষায় প্রথম পাঁচ বছর ইভিতে শুল্কছাড় মিলবে না

চুক্তি ঘোষণার পর ভারতীয় গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলির শেয়ারের দর প্রায় ১.৬ শতাংশ কমেছে।

ইইউ কী পাবে

ইইউ কর্মকর্তাদের দাবি, ভারতে রপ্তানিকৃত ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক উঠে যাবে বা কমবে। ফলে ইউরোপীয় সংস্থাগুলির বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো সাশ্রয় হবে।

যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ, বিমান ও মহাকাশ শিল্পে বড় সুবিধা পাবে ইউরোপ।

চুক্তি কার্যকর কবে

ভারতের বাণিজ্য অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর জানিয়েছেন, চুক্তির চূড়ান্ত আইনি যাচাই শেষ হলে সম্ভবত আগামী বছর এটি কার্যকর হবে।

সামগ্রিক গুরুত্ব

বর্তমানে ভারত–ইইউ পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩৬ বিলিয়ন ডলার। লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। ইইউ ইতিমধ্যেই ভারতের সবচেয়ে বড় পণ্য বাণিজ্য অংশীদার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্য নয়—ভারত ও ইউরোপের কৌশলগত, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।