Abhijit Banerjee: আমেরিকা যতটা মনে করে, ভারতের ততটা যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতার প্রয়োজন নেই: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তাও—বিশেষ করে আমেরিকার উদ্দেশে।
ভারত–ইইউ এফটিএ: ওয়াশিংটনের উদ্দেশে কৌশলগত ইঙ্গিত
পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ভারত–ইইউ এফটিএ একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যালাইনমেন্ট’, যা ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে ভারত আমেরিকার উপর যতটা নির্ভরশীল বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, বাস্তবে ততটা নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় উচ্চ শুল্ক আরোপ এবং ভারতের সঙ্গে সীমিত দরকষাকষির প্রেক্ষাপটে এই বার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, বহুল প্রচারিত এই চুক্তি—যাকে অনেকেই ‘মাদার অফ অল ডিলস’ বলছেন—স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের জন্য ব্যাপক লাভ এনে দেবে না, যদি না দেশীয় স্তরে দক্ষতা ও পরিকাঠামোগত উন্নতি ঘটে।
চুক্তির পরিসর ও সম্ভাব্য লাভ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের বাজার তৈরি করতে চলা এই এফটিএ বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ। চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের ৯৯ শতাংশ রপ্তানির উপর শুল্ক তুলে নেওয়া হবে এবং ভারতে ইইউ-র ৯৭ শতাংশ রপ্তানিতে শুল্ক কমানো হবে।
এর ফলে ভারতের টেক্সটাইল, পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, জুতো ও সামুদ্রিক পণ্য খাত লাভবান হতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপ লাভ পেতে পারে মদ, গাড়ি, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পে।
দক্ষতা ও সরবরাহ ব্যবস্থাই আসল চ্যালেঞ্জ
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, বাণিজ্য চুক্তি কেবল সূচনা মাত্র। তিনি বলেন, “বিক্রি করার মতো পণ্য থাকতে হবে এবং সেই পণ্যের প্রতি বাজারে চাহিদা থাকতে হবে।” তাঁর দাবি, ‘আজকের দিনে প্রতিযোগিতার আসল মাপকাঠি শুধু শুল্ক নয়—বরং সরবরাহের গতি, পরিবহণ ব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্যতা।’
তিনি বলেন, ‘টেক্সটাইল, চামড়া ও গয়নার মতো খাতে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান থাকলেও ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের মতো দেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে।’ বিশেষ করে চিনের সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি বলেন, ‘দ্রুত ডেলিভারি ও দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় দাম সমান হলেও ক্রেতারা চিনকেই বেছে নেন।’
তিনি বলেন, “ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থা ধীর, বন্দরগুলিও সেভাবে দক্ষ নয়—এই বিষয়গুলো বড় ভূমিকা নেয়।’ তাঁর মতে, ‘চিনের মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারলেই ভারত এই ধরনের বাণিজ্য চুক্তি থেকে প্রকৃত লাভ তুলতে পারবে।’
আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্ন
বর্তমানে আমেরিকার আরোপিত উচ্চ শুল্ক—যার মধ্যে রুশ তেল কেনার কারণে ভারতের উপর অতিরিক্ত শুল্কও রয়েছে—বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ভারত এই পদক্ষেপকে ‘অন্যায্য ও অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আমেরিকার ভারত-বিরোধী মনোভাব পুরোপুরি বোঝা যায়নি। কখনও কখনও চুক্তির আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তা অস্বীকার করা হয়েছে।’
ইইউ কি আমেরিকার বিকল্প হতে পারে? এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ইউরোপ বড় বাজার হলেও আমেরিকার তুলনায় তার ব্যাপ্তি অনেক কম। তিনি বলেন, “আমেরিকা একটি বিশাল বাজার। ইউরোপ মূলত বিলাসপণ্য ও যন্ত্রাংশে শক্তিশালী।”
ভারত–ইইউ এফটিএ নিঃসন্দেহে কৌশলগত ও সম্ভাবনাময়
সব মিলিয়ে, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ভারত–ইইউ এফটিএ নিঃসন্দেহে কৌশলগত ও সম্ভাবনাময়, কিন্তু এর সুফল নির্ভর করবে ভারতের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির উপর।


