সোশ্যাল মিডিয়ায় কর্মকাণ্ডের কারণ দেখিয়ে অনেকের ভিসা প্রত্যাখ্যান করলো যুক্তরাষ্ট্র
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত বিতর্কে বড়সড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিল যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাক্তন এক শীর্ষ কমিশনারসহ মোট ৫ জন বিদেশি নাগরিকের ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এই ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি ও মতপ্রকাশ দমন করতে ‘বাধ্য’ করার চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও বাকস্বাধীনতার উপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বলেই ব্যাখ্যা করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “এই উগ্রপন্থী কর্মী ও অস্ত্রধারী এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে বহু বিদেশি রাষ্ট্র কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা আমেরিকান বক্তা ও আমেরিকান কোম্পানিকেই নিশানা করেছে।”
ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় যাদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইউরোপীয় কমিশনের প্রাক্তন শীর্ষ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রক থিয়েরি ব্রেটন। স্টেট ডিপার্টমেন্ট ব্রেটনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA)-এর ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই আইন সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলোর উপর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের বিধান আরোপ করে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে ‘চিরুনি অভিযান’ বলে কটাক্ষ করেছেন ব্রেটন নিজেই। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের উদ্দেশ্যে—সেন্সরশিপ আপনার ভাবনার জায়গায় নেই।”
ডিএসএ কার্যকর করা নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ও এক্স-এর মালিক ইলন মাস্কের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছে ব্রেটনের। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশন ব্লু টিক ব্যাজ সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে এক্স-কে ১২০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা করে। ডিএসএ-র অধীনে এটিই প্রথম বড় অঙ্কের জরিমানা। কমিশনের দাবি, এক্সের ব্লু টিক ব্যবস্থা ‘প্রতারণামূলক’, কারণ এতে ব্যবহারকারীদের যথাযথ যাচাই করা হচ্ছিল না। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কমিশনের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয় মাস্কের প্ল্যাটফর্ম।
ভিসা নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও রয়েছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইনডেক্স (GDI)-এর প্রধান ক্লেয়ার মেলফোর্ড। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সারা বি রজার্স অভিযোগ করেন, জিডিআই মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম ও বক্তৃতাকে সেন্সর ও ব্ল্যাকলিস্ট করেছে।
যদিও বিবিসিকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জিডিআই-এর মুখপাত্র এই অভিযোগ খারিজ করে বলেন, “এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা বাকস্বাধীনতার উপর একটি কর্তৃত্ববাদী আক্রমণ এবং সরকারি সেন্সরশিপের জঘন্য উদাহরণ।”
এছাড়াও অনলাইনে ঘৃণা ও ভুয়ো তথ্যের বিরুদ্ধে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট (CCDH)-এর প্রধান ইমরান আহমেদ, জার্মান সংস্থা হেটএইডের আনা-লেনা ভন হোডেনবার্গ ও জোসেফাইন ব্যালনও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, তাঁরা সক্রিয়ভাবে ডিএসএ কার্যকর করতে ভূমিকা নিয়েছিলেন।
হেটএইড-এর দুই সিইও এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “আইনের শাসনকে উপেক্ষা করে সমালোচকদের চুপ করানোর চেষ্টা করা সরকারের দমন-পীড়নের কাছে আমরা মাথা নত করব না।”
মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, “বিশ্বব্যাপী সেন্সরশিপ-শিল্প কমপ্লেক্সের এজেন্টদের উপর এই ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আমেরিকান সার্বভৌমত্বের কোনও লঙ্ঘন মেনে নেবে না।”
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ডিজিটাল নীতি, বাকস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ নিয়ে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।


