Friday, January 30, 2026
Latestদেশ

Madras High Court: কাল্লাঝাগর মন্দিরের তহবিলে রাজ্যের ‘বেআইনি হস্তক্ষেপ’: ডিএমকে সরকার ও HR&CE দফতরকে তীব্র ভর্ৎসনা মাদ্রাজ হাইকোর্টের

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: ঐতিহাসিক ১০৮ দিব্য দেশম শ্রী কাল্লাঝাগর মন্দিরের তহবিল ব্যবহার করে তথাকথিত ‘আইকনিক প্রোজেক্ট’ বাস্তবায়নের উদ্যোগকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। এক নজিরবিহীন ও তীব্র ভাষায় দেওয়া রায়ে আদালত জানিয়ে দিয়েছে, মন্দির কোনও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, আর দেবতার সম্পত্তি ব্যবহারে রাজ্যের কোনও একতরফা অধিকার নেই।

মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চের ডিভিশন বেঞ্চ—বিচারপতি অনিতা সুমন্ত ও বিচারপতি সি. কুমারাপ্পন—তামিলনাড়ু সরকারের জারি করা G.O. Ms. No.135 (৮ মার্চ, ২০২৪) এবং তার ভিত্তিতে ১১ অক্টোবর, ২০২৪-এর কার্যাদেশ সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেয়।

‘মন্দিরকে রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে পরিণত করা হয়েছে’

এই মামলার কেন্দ্রে ছিল তামিলনাড়ু সরকারের সিদ্ধান্ত—কাল্লাঝাগর মন্দিরকে ‘আইকনিক প্রোজেক্ট’-এর অন্তর্ভুক্ত করে প্রায় ৯২ কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্প ঘোষণা করা। পরে সেই অঙ্ক সংশোধন করে ৪০ কোটি টাকা করা হয়। পরিকল্পনায় ছিল শৌচালয়, ডাইনিং হল, অতিথিশালা, দোকানঘর, পার্কিং এলাকা ও সিউয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ—সবই মন্দিরের উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে।

আদালত এই ধারণাকেই নস্যাৎ করে দিয়ে মন্তব্য করেছে, “HR&CE দফতর মন্দিরকে এমন এক ‘প্রোজেক্ট’ হিসেবে দেখছে, যার উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ প্রয়োজন—এই চিন্তাধারা একটি মন্দিরের ধারণার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।”

রাজ্যের ‘কোনও ভূমিকা নেই’ মন্দির উন্নয়নে

রায়ের অন্যতম কঠোর অংশে আদালত স্পষ্ট জানায়, মন্দির সংক্রান্ত কোনও বড় প্রকল্প কল্পনা করা, ঘোষণা করা বা বাস্তবায়ন করা রাজ্য সরকারের কাজই নয়।

বেঞ্চ জানিয়েছে, “মন্দিরের তহবিল ব্যবহারের বিষয়ে রাজ্যের কোনও একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। স্পষ্ট করে বললে—তাদের কোনও ব্যবসাই নেই এই অর্থ এভাবে ব্যবহার করার।”

আদালত মনে করিয়ে দেয়, সংবিধানের ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন সুরক্ষিত। মন্দিরের সম্পত্তি ও অর্থ ব্যবহারের একমাত্র আইনগত অধিকার রয়েছে ট্রাস্টি বোর্ডের।

১৩ বছর ধরে ট্রাস্টি বোর্ড নেই: ‘আইনের প্রহসন’

রায়ে HR&CE দফতরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে আদালত জানায়, গত ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাল্লাঝাগর মন্দিরে কোনও ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়নি—যা সরাসরি HR&CE আইনের ধারা ৪৭(iii) লঙ্ঘন।

আদালতের মন্তব্য, “এত বড় ও আয়সমৃদ্ধ একটি মন্দিরকে ফিট পার্সন ও এক্সিকিউটিভ অফিসারের হাতে বছরের পর বছর ছেড়ে দেওয়া আইনটির কাঠামোর সঙ্গে একেবারেই অসঙ্গত।”

উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে নিযুক্ত এক্সিকিউটিভ অফিসারই কার্যত অনির্দিষ্টকাল দায়িত্বে ছিলেন—যা সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের পরিপন্থী।

আর্থিক অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র

৯১ পাতার রায়ে আদালত HR&CE দফতরের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে “চরম অবহেলাপূর্ণ” বলে আখ্যা দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে—

  • HR&CE আইনের ধারা ৮৬ অনুযায়ী কোনও বাজেটই তৈরি হয়নি
  • ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনও স্বচ্ছতা বা অনুমোদনের নথি নেই
  • গত তিন অর্থবর্ষে কোনও অডিটের প্রমাণ মেলেনি
  • আইনগত অনুমোদন ছাড়াই বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করা হয়েছে
  • এক বছরে উধাও ৪৫ কোটি টাকা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হিসেবে আদালত জানায়, ২০২৩ সালে যেখানে মন্দিরের উদ্বৃত্ত তহবিল ছিল প্রায় ১০৭.৬ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৬২ কোটিতে—অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার হ্রাস।

বেঞ্চের মন্তব্য, “এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে কোনও বাজেট ছাড়াই এবং আইনগত অনুমোদন ছাড়া। এটি গুরুতর বিষয়।”

‘মন্দিরের সমস্ত সম্পত্তি ও তহবিলের মালিক দেবতা স্বয়ং’

আদালত স্পষ্ট করে জানায়—মন্দিরের সমস্ত সম্পত্তি ও তহবিলের মালিক দেবতা স্বয়ং। রাজ্য সরকার, HR&CE দফতর, ট্রাস্টি বা মন্ত্রীরা কেউই এর মালিক নন।

রায়ে বলা হয়, “অনুমতি ছাড়া দেবতার অর্থ ব্যবহার করা একটি ‘দেবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’।”

সরকারি নির্দেশ বাতিল, নির্মাণকাজ স্থগিত

আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশে—

  • G.O. Ms. No.135 (08.03.2024) বাতিল
  • ১১.১০.২০২৪-এর কার্যাদেশ খারিজ
  • সব ধরনের নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ বহাল
  • ভবিষ্যতে মন্দির পরিচালনায় সংবিধান ও আইনের কঠোর অনুসরণের নির্দেশ

শত শত মন্দিরের ক্ষেত্রে নজির স্থাপন

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধুমাত্র কাল্লাঝাগর মন্দির নয়—তামিলনাড়ুর শত শত মন্দিরের ক্ষেত্রে নজির স্থাপন করল, যেগুলি দীর্ঘদিন ধরে ট্রাস্টি বোর্ড ছাড়াই HR&CE-র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

রায়ে আদালতের স্পষ্ট বার্তা— “নিয়ন্ত্রণের অধিকার মানে দখলদারির অধিকার নয়।”

এই রায় রাজ্যের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সরকারের ভূমিকার উপর একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক সীমারেখা টেনে দিল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তথ্যসূত্র: কমিউন