Saturday, January 24, 2026
Latestদেশ

Kerala: ফলোয়ার বাড়াতে ভিডিও পোস্ট? মামলা দায়ের হতেই পলাতক ইনফ্লুয়েন্সার শিমজিথা মুস্তফা

কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: কেরলের কোঝিকোড়ে একটি সরকারি বাসে ব্যক্তির ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করেছিল এক মহিলা ইনফ্লুয়েন্সার। ভাইরাল ভিডিও শেষ পর্যন্ত প্রাণ কেড়ে নেয় ওই ব্যক্তির। যৌন হেনস্থার অভিযোগে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর জেরে মানসিক চাপে পড়ে আত্মহত্যা করেন ৪০ বছর বয়সী দীপক ইউ (Deepak U)। ঘটনার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ভিডিও দেখে নেটিজেনদের প্রশ্ন, এটি কিভাবে যৌন হেনস্থা হয়? তাদের একাংশের দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিউ ও ফলোয়ার বাড়াতেই এই কান্ড ঘটিয়েছে ওই ইনফ্লুয়েন্সার।

এই ঘটনায় অভিযোগকারী শিমজিথা মুস্তাফার (Shimjitha Musthafa) বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে কেরল পুলিশ। বর্তমানে পলাতক সে। 

কী ঘটেছিল সেদিন বাসে?

১৬ জানুয়ারি কোঝিকোড়ের একটি কেএসআরটিসি (KSRTC) বাসে যাত্রা করছিলেন দীপক ইউ ও শিমজিথা মুস্তাফা। বাসটি ভিড়ঠাসা ছিল। সেই সময় শিমজিথা একটি ভিডিও রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন, যেখানে তিনি দাবি করেন, দীপক তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে স্পর্শ করেছেন।

ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, দীপক ওই মহিলার থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। চলন্ত বাসে সিটের উপরের অংশ ধরে নিজেকে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। প্রথম কয়েক সেকেন্ডের জন্য, ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল যেখানে মহিলাটি দীপককে দেখাচ্ছে, যিনি তার থেকে কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। ভিডিওর পরবর্তী অংশে অন্য কোণ থেকে মহিলাটিকে দেখানো হয়েছে, যেখানে তিনি দীপকের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন এবং ক্যামেরাটি দেখিয়েছেন যে তার কনুই কীভাবে নড়াচড়া করছে। দীপক, দৃশ্যত জানেন না যে একটি ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, তার অবস্থান চালিয়ে যান। এক পর্যায়ে একবার তার কনুই অনিচ্ছাকৃতভাবে মহিলার বুকে স্পর্শ করে, যিনি তখন তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় তীব্র সমালোচনা ও ট্রোলিং। পরে শিমজিথা আরও একটি ভিডিও পোস্ট করে অভিযোগে অনড় থাকেন। তার দাবি, ঘটনাটি দুর্ঘটনা নয়, বরং ইচ্ছাকৃত যৌন হেনস্থা।

আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করে শিমজিথা বলেন, দীপক ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে স্পর্শ করেছেন এবং তার যৌন হেনস্থা। শিমজিথা লেখেন, “গতকাল, আমি একটি পাবলিক বাস থেকে একটি ভিডিও শেয়ার করেছি যেখানে একজন পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে আমার সম্মতি ছাড়াই আমাকে স্পর্শ করেছে। এটি কোনও দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি ছিল না। এটি আমার যৌন সীমানার স্পষ্ট লঙ্ঘন ছিল। আমার সামনে একজন মহিলা অস্বস্তিকর অবস্থায় থাকতে দেখে আমি রেকর্ডিং শুরু করি। রেকর্ডিং করা হচ্ছে তা জানা সত্ত্বেও, লোকটি এগিয়ে গিয়ে আমাকে স্পর্শ করে। এটি একটি ইচ্ছাকৃত কাজ, সহানুভূতির অভাব এবং বিশ্বাস প্রকাশ করে যে তাকে কোনও পরিণতি ভোগ করতে হবে না।”

মানসিক চাপ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

ভাইরাল ভিডিওর পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন দীপক। পরিবারের সদস্যদের তিনি জানান, তাঁর কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না এবং স্পর্শটি ছিল অনিচ্ছাকৃত।

১৮ জানুয়ারি সকালে বাড়ির ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় দীপকের দেহ উদ্ধার হয়। তাঁর মা কান্যাকা অভিযোগ করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও গুরুতর অভিযোগের মানসিক চাপই তাঁর ছেলেকে এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। তাঁর কথায়, “শনিবার দীপকের জন্মদিন ছিল। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয় দীপক। আমার ছেলে কখনও কোনও অন্যায় কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। অপমান সে সহ্য করতে পারেনি।”

অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে মামলা

দীপকের মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে শিমজিথা মুস্তাফার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর ধারা ১০৮ (আত্মহত্যায় প্ররোচনা) অনুযায়ী মামলা রুজু করা হয়েছে। কোঝিকোড় মেডিক্যাল কলেজ থানার পুলিশ ইতিমধ্যেই তার বয়ান রেকর্ড করেছে। পাশাপাশি কেরল মানবাধিকার কমিশনও ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ও ‘কার্ডবোর্ড প্রটেস্ট’


ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। দীপকের সমর্থনে সোচ্চার হয়েছেন অনেকে। ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও ও মিম শেয়ার হচ্ছে।

ভাইরাল হয়েছে এমন সব ভিডিও, যেখানে পুরুষ যাত্রীরা বাসে উঠছেন কার্ডবোর্ড বাক্স পরে বা শরীর থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন—যেন কোনওভাবেই ‘ভুল অভিযোগে’ না পড়তে হয়। কেউ কেউ একে বলছেন ডার্ক হিউমার, আবার কারও মতে এটি পুরুষদের নিরাপত্তাহীনতার প্রকাশ।


প্রশ্নের মুখে সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যদি অভিযোগ এতটাই গুরুতর ছিল, তবে সরাসরি পুলিশের কাছে না গিয়ে কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও পোস্ট করা হল? অনেকেই মনে করছেন, আইনি প্রক্রিয়ার বদলে জনতার আদালতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতাই এই মৃত্যুর পথ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার শক্তিশালী মাধ্যম, অন্যদিকে তা দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ব্যবহার হলে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

শিমজিথা মুস্তাফা কে?


শিমজিথা মুস্তাফা কোঝিকোড় জেলার ভাটাকারা এলাকার বাসিন্দা। তিনি স্নাতকোত্তর শিক্ষিত এবং বিএড ডিগ্রিধারী। একসময় তিনি ভারতীয় ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (IUML)-এর টিকিটে গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দলীয় মতবিরোধের জেরে রাজনীতি থেকে সরে এসে সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট তৈরিকে পেশা হিসেবে নেন।

তথ্যসূত্র: OP India