Erfan Soltani: বিচার ছাড়াই বিরোধী কন্ঠ এরফানকে ফাঁসি দিচ্ছে ইরান, আটক ১০ হাজার মানুষকেও কী ফাঁসি দেবে খামেনেই সরকার?
কলকাতা ট্রিবিউন ডেস্ক: এরফান সোলতানির বয়স মাত্র ২৬। গত সপ্তাহে তেহরানের রাজপথে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন তিনি। সেই অপরাধে বুধবার স্থানীয় সময় বুধবার ভোরে, তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাবে ইরান সরকার। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের সরকার এই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৮ জানুয়ারি। ইরানের করজ শহরের ফারদিস এলাকা থেকে এরফানকে গ্রেফতার করে নিরাপত্তা বাহিনী। গ্রেফতারের পর টানা ৩ দিন তাঁর কোনও খোঁজ পায়নি পরিবার। কোথায় রাখা হয়েছে, কী অভিযোগ—কিছুই জানানো হয়নি।
১১ জানুয়ারি, হঠাৎ করেই ফোন করে পরিবারের কাছে জানানো হয়, এরফান রাষ্ট্রের হেফাজতে রয়েছেন এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরও জানানো হয়, বুধবার ভোরেই কার্যকর হবে সেই রায়। পরিবার কিছু বোঝার আগেই কার্যত সব শেষ হয়ে যায়।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, গ্রেফতারের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা ইরানের আইনি কাঠামোতেই অসম্ভব। কোনও শুনানি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কিংবা আইনজীবীর উপস্থিতি—কিছুই ছিল না। তাই এই রায়কে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বলেই আখ্যা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এরফানের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ‘মোহারেবা’, অর্থাৎ ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা’-র অভিযোগ। ইরানের আইনে এটি অন্যতম গুরুতর অপরাধ। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, ভিন্নমত দমন ও আন্দোলনকারীদের কণ্ঠরোধ করতেই এই ধারা নিয়মিতভাবে ব্যবহার করে থাকে খামেনেই প্রশাসন।
পরিবারের দাবি, এরফান কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি পেশায় ছিলেন পোশাকশিল্পের কর্মী। ফ্যাশন ও বডিবিল্ডিং ছিল তাঁর নেশা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে থাকা ছবিগুলোতেই ধরা পড়ে এক সাধারণ তরুণের জীবনযাপন।
তবে অন্যায়ের প্রতিবাদে পিছিয়ে আসেননি তিনি। পরিবারের বক্তব্য, গ্রেপ্তারের আগেও একাধিকবার হুমকি পেয়েছিলেন এরফান। তবুও তিনি রাজপথ ছাড়েননি। সেই ‘অপরাধেই’ আজ তাঁর প্রাণ সংশয়ের মুখে।
এরফানের পরিবারকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই সাজা পুনর্বিবেচনার কোনও সুযোগ নেই। আন্দোলনে ধৃতদের মৃত্যুদণ্ডই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এমনকী সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললে পরিবারের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
চরম আতঙ্কের মধ্যেই বহু অনুনয়-বিনয়ের পর মৃত্যুর আগে মাত্র ১০ মিনিটের জন্য এরফানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পান তাঁর পরিবার। সেই সাক্ষাৎই ছিল শেষ দেখা, শেষ বিদায়।
মানবাধিকার আইনজীবী মহম্মদ ওলিয়াইফার্ড বলেন, “ইরানের আইনে কাউকে ৩ দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি দেওয়া সম্ভব নয়। এমনকি সরকারি আইনজীবী থাকলেও ন্যূনতম ১০ দিন সময় লাগে। এটি স্পষ্টতই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।”
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এই ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়াই সরকারের মূল উদ্দেশ্য।
এদিকে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, ফাঁসি কার্যকর হলে ওয়াশিংটন কঠোরতম পদক্ষেপ নেবে। তবে সেই হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই আদৌ এরফানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত—বাইরের পৃথিবী থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ইরানে এরফানের মতো আরও কত তরুণ যে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছেন, তার সঠিক হিসাব হয়তো কোনওদিনই সামনে আসবে না।
উল্লেখ্য, এখনও পর্যন্ত ইরানে ২৫০০ এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কোনো কোনো রিপোর্ট অনুযায়ী সংখ্যাটা ১২ হাজারেরও বেশি। গ্রেফতার করা হয়েছে ১০ হাজার বিক্ষোভকারীকে। আশঙ্কা করা হচ্ছে বিক্ষোভ শান্ত করতে ধৃতদের ফাঁসি দেওয়া হতে পারে।


