Friday, April 12, 2024
আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশের চন্দ্রনাথ ধামকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে

সংগ্রাম দত্ত: সারা বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ ধামের প্রায় তিন হাজার একরের ওপর ভূমি বেদখল হয়ে গেছে বলে জানা গেছে । বাড়বকুন্ড ও লবণাক্ষ তীর্থক্ষেত্রে মন্দির গুলো বিলুপ্তির পথে। এসব নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর পোস্ট দেখা যাচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থ ক্ষেত্র চন্দ্রনাথ ধাম ও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ গুলোর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছুদিন পূর্বে চট্টগ্রাম প্রবর্তক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে প্রায় দেড়শতাধিক সনাতনী সাধু পরবর্তীতে বাংলাদেশ হিন্দু মহাজুটের সাধারণ সম্পাদক শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের নেতৃত্বে নেতৃবৃন্দ চন্দ্রনাথ ধাম ও তার অংশগুলোর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। সনাতনী নেতারা চন্দ্রনাথ ধাম রক্ষা ও বাড়বকুন্ড পুরোহিতের উপর সন্ত্রাসী হামলা ও জমি দখলের পাঁয়তারার বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।

জানা গেছে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ ধাম সারাবিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান একটি তীর্থভূমি।

 পুরাণ মতে এখানে যুগে যুগে এসে অবস্থান করেছিলেন ভগবান শ্রী রামচন্দ্র, লক্ষণ, সীতা দেবী, মহর্ষি ব্যাসদেবসহ অসংখ্য দেব-দেবতা ও মুনি ঋষি। এখানে স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবাদিদেব মহাদেব।

প্রতিবছর বাংলা ফাগুন মাসে (ইংরেজি ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস) বড় মেলা হয় যা শিবচতুর্দশী মেলা নামে পরিচিত। এ সময় বিদেশের অনেক সাধু-সন্ন্যাসী এবং বিশেষ করে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা থেকে এখানে আসেন।

কথিত আছে যে নেপালের রাজা স্বপ্নে দেবতার আদেশে উপমহাদেশের পাঁচ কোণে পাঁচটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন। এগুলো হলো নেপালের পশুপতিনাথ, ভারতের উত্তরপ্রদেশের কাশিতে বিশ্বনাথ, পাকিস্তানে ভূতনাথ, বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার মহেশখালী আদিনাথ ও বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় চন্দ্রনাথ। 

সনাতন প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, সত্যযুগে এখানে মহামুণি ভার্গব বসবাস করতেন। অযোদ্ধার রাজা দশরথের পুত্র শ্রী রামচন্দ্র তাঁর বনবাসের সময় এখানে এসেছিলেন। মহামুণি ভার্গব রামচন্দ্র আসবেন জানতে পেরে তাঁদের জন্য তিনটি কুণ্ড সৃষ্টি করেন এবং এখানে রামচন্দ্রের ভ্রমণকালে তাঁর স্ত্রী সীতা এই কুণ্ডগুলো ব্যবহার করেন। এ কারণেই এখানকার নাম সীতাকুণ্ড বলে অনেকের ধারণা।

পুরাণে আছে, শিবের স্ত্রী সতীর পিতা রাজা দক্ষ যজ্ঞ্যানুষ্ঠান করছিলেন, কিন্তু তিনি শিবকে ছাড়া আর সব দেব-দেবীকে সে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করেন। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী সে যজ্ঞে আত্মাহূতি দিয়ে দেহত্যাগ করেন। ভগবান শিব তখন সতীর মৃতদেহ নিয়ে প্রলয় নৃত্য করতে থাকেন। পুরো সৃষ্টি ধ্বংস হবে দেখে ভগবান বিষ্ণু শিবের প্রলয় নৃত্য বন্ধ করার জন্য তার সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ড খণ্ড করে ফেলে দেন। এই দেহাবশেষ ৫১ খণ্ড করে ৫১ স্থানে ফেলা হয়, তা থেকে ৫১ মাতৃপীঠ বা শক্তিপীঠের সৃষ্টি হয়েছে। পুরাণে উল্লেখ আছে যে, সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সতীর ডান হাত পড়েছে। এই পীঠস্থানটিই ভবানী মন্দির, এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালী। 

বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির। চন্দ্রনাথ মন্দিরের পাদদেশে রয়েছে ক্রমধেশ্বরী কালী মন্দির, ভোলানন্দগিরি সেবাশ্রম, কাছারি বাড়ি, শনি ঠাকুর বাড়ি, প্রেমতলা, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী সেবাশ্রম, শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, গিরিশ ধর্মশালা, দোল চত্বর, এনজি সাহা তীর্থযাত্রী নিবাস, তীর্থ গুরু মোহন্ত আস্তানা, বিবেকানন্দ স্মৃতি পঞ্চবটি, জগন্নাথ আশ্রম, শ্রীকৃষ্ণ মন্দির, মহাশ্মশানভবানী মন্দির, সয়ম্ভুনাথ মন্দির, গয়াক্ষেত্র জগন্নাথ মন্দির, বিরূপাক্ষ মন্দির, পাতালপুরী, অন্নপূর্ণা মন্দির ইত্যাদি। এখানে ৬টি ধর্মশালা আছে, যার ৩টি বাংলাদেশ রেলওয়ের, সেগুলো ব্রিটিশ আমলে তৈরি।

চন্দনাথ মন্দিরে যাওয়ার পথে ব্যাসকুণ্ডের পশ্চিম পাড়ে এবং ভৈরব মন্দিরের বাম পাশে একটা বিশাল বটগাছ আছে, এটি অক্ষয় বট নামে পরিচিত। সয়ম্ভুনাথ মন্দিরের উত্তর পাশে অন্নপূর্ণা ও বিষ্ণু মন্দির অবস্থিত। এখানে সারাবছর ধরে প্রতিদিন পূজা হয়। সয়ম্ভুনাথ মন্দির হতে বিরূপাক্ষ মন্দির যাবার পথে রাস্তা পূর্ব পাশে একটি বড় শিলাখণ্ড দেখা যায়, যা ছত্র শিলা নামে পরিচিত, কেউ কেউ একে সরস্বতী শিলাও বলে থাকেন। বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরের দূরত্ব প্রায় আধামাইল। এটি ভগবান শিবের প্রধান মন্দির। এই মন্দির সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২-১৩শ’ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই মন্দিরে প্রতিদিন পূজা হয়। সয়ম্ভুনাথ মন্দির থেকে সামান্য পূর্ব দিকে গেলে চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাওয়ার পথের বাম পাশে ৩০/৪০টি সিঁড়ি নিচের দিকে গেলেই গয়াক্ষেত্র দেখা যায়। এখানে একটি কুণ্ডের মতো আছে। এই কুণ্ডের মধ্য দিয়ে মন্থন নদী পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে গেছে। সয়ম্ভুনাথ মন্দিরের কাছাকাছি সীতা মন্দিরের সামনে পাহাড়ের ওপরে রয়েছে হনুমান মন্দির। 

বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাবার পথে রাস্তার পূর্ব দিকে আধামাইলের মতো নিচের দিকে গেলে পাতালপুরী দেখা যায়। এখানে হর গৌরী, দ্বাদশ শালগ্রাম, বিশ্বেশ্বর শিব, পাতালকালী, অষ্টবসু, রূদ্রেশ্বর শিব, গোপেশ্বর শিব, পঞ্চানন শিব, মন্দাকিনী, পাতাল গঙ্গাসহ অন্য দেব-দেবী রয়েছেন। তবে গহীন অরণ্য এবং বিপজ্জনক স্থান হওয়ার কারণে তীর্থযাত্রী ব্যাতীত মানুষ এখানে সহজে যায় না। সয়ম্ভুনাথ মন্দির থেকে বিরূপাক্ষ মন্দিরে যাওয়ার পথে রাস্তার বাম পাশে গিরি গুহার অভ্যন্তরে উনকোটি শিব অবস্থিত।

সীতাকুণ্ডে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাতীর্থ চন্দ্রনাথ ধামের অবিচ্ছেদ্য অংশ লবণাক্ষের মঠ-মন্দিরগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে। কয়েক শ বছরের পুরনো মন্দিরগুলো স্থাপনের পর থেকে সংস্কার না হওয়ায় এগুলো ভেঙে গাছপালা ও মাটি চাপা পড়েছে। ইতোমধ্যে নিশ্চিহ্নও হয়ে গেছে মন্দিরগুলোর অংশ বিশেষ। কিন্তু এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কারো। ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তীর্থভূমি।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন পৃথিবীর সকল তীর্থদর্শন করেও কেউ যদি চন্দ্রনাথ ধাম দর্শন না করেন তবে তীর্থ দর্শন সম্পন্ন হয় না। আবার এই চন্দ্রনাথ মহাতীর্থের তিনটি অবিচ্ছেদ্য অংশ রয়েছে।

উত্তরে ছোট দারোগার হাটে লবণাক্ষ ও দক্ষিণে বাড়বকুণ্ডে বাড়বানল। কেউ চন্দ্রনাথ তীর্থ করতে এলে তাকে অবশ্যই একই সাথে লবণাক্ষ ও বাড়বানল দর্শন করতে হয়। নইলে চন্দ্রনাথ দর্শনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এ কারণে চন্দ্রনাথের পাশাপাশি লবণাক্ষ ও বাড়বানল সমান গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু প্রচারের অভাবে বহু সনাতন ধর্মাবলম্বী এসব তথ্য অবগত নন।

চন্দ্রনাথ ধামের প্রচারণা চালালেও লবণাক্ষ ও বাড়বানলের কথা তেমন একটা প্রচার করেন না।

সূত্র জানায়, চন্দ্রনাথ ধাম, লবণাক্ষ ও বাড়বানল একই তীর্থের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এগুলো পৃথক পৃথক মোহন্তের অধীনে। এর আয় ব্যয়ও যার যার ওপর বর্তায়। ফলে যেটি যার অধীনে তারাই শুধু সেটি নিয়ে ভাবেন। অন্য অংশটি থাকল কি হারিয়ে গেল এ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। অন্যদিকে পৌরসদরে সুলভ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে চন্দ্রনাথে সারাবছর দর্শনার্থীর আগমন হলেও লবণাক্ষ বা বাড়বানলে পুণ্যার্থীর সংখ্যা কম। কেবলমাত্র শিব চতুর্দশী, দোল পূর্ণিমাসহ কিছু কিছু বিশেষ তিথিতে এখানে পুণ্যার্থীর ঢল নামে। কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসব তীর্থের উন্নয়ন নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কারো। আর দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে বর্তমানে লবণাক্ষ তীর্থের মঠ-মন্দিরগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে। ছোট দারোগার হাটে অবস্থিত লবণাক্ষ তীর্থে লবণাক্ষ মন্দির, ব্রহ্ম কুণ্ড, সূর্যকুণ্ড ও অগ্নিকুণ্ড মন্দিরগুলো বিলুপ্তের পথে। এগুলো খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল হয়ে পড়েছে। লবণাক্ষ মন্দিরটি এখন আর মন্দিরের অবস্থায় নেই। এর অধিকাংশই পাহাড়ের গাছপালা ও জলাধার নির্মাণকালে খননে উত্তোলন করা মাটির নিচে চাপা পড়েছে। আর সামনের অংশটি দেখা গেলেও সেখানে পূজা অর্চনা করার পরিবেশ নেই। ফলে সেখানে এখন আর নিয়মিত পূজা অর্চনা হয় না। একই অবস্থা অন্য মন্দিরগুলোর। সেখানেও গিয়েও ব্রহ্মকুণ্ড, সূর্যকুণ্ড ও অগ্নিকুণ্ড খুঁজে পাওয়া মুস্কিল হয়ে পড়েছে।

লবণাক্ষ তীর্থের ৩০ একরের মতো সম্পদ আছে। এর ১৬-১৭ একরের মতো বেদখল হয়ে গেছে। এগার বছর মামলা পরিচালনা করে তিন একর উদ্ধার হয়েছে। অন্য সম্পত্তি উদ্ধারে মামলা চলছে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় তীর্থক্ষেত্রটি কিছুদিন যাবত চন্দ্রনাথ ধামকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের চক্রান্ত চলছে । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে দেশের শীর্ষ স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে এর সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ হতে দেখা যায়নি।

গত ২৯ শে ডিসেম্বর ২০২৩ মন্দিরকে কেন্দ্র করে মন্দির সংলগ্ন এলাকায় মারামারি ঘটনাও ঘটেছে যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্টে জানা গেছে। 

উল্লেখ্য যে , সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আটশ বছর পুরোনা তীর্থস্থান চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধাম পাহাড় ও মন্দির নিয়ে এমন বিতর্কিত পোস্ট দেওয়ায়

চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর থেকে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক সমকাল গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ” চন্দ্রনাথ মন্দির নিয়ে বিতর্কিত পোস্ট, গ্রেপ্তার ২ ” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ছেপেছে।

এরূপ পরিস্থিতিতে ১ জানুয়ারি ২০২৪ চট্টগ্রাম প্রবর্তক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী নেতৃত্বে প্রায় দেড়শতাধিক সাধু সন্ন্যাসী চট্টগ্রাম দান ও তার বিভিন্ন অংশ মন্দির ও মতগুলো পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদক শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ হিন্দু মহাজুটের নেতৃবৃন্দ চন্দ্রনাথ ধাম পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন ।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামের পবিত্রতা নষ্টের চেষ্টা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক প্রচারণার প্রতিবাদে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে শ্রী শ্রী চন্দ্রনাথ ধাম রক্ষা পরিষদ এবং বাড়বকুণ্ড তীর্থধাম উন্নয়ন কমিটি। এ সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সনাতনী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে দেবোত্তর সম্পত্তি আত্মসাতের ষড়যন্ত্র, বাড়বকুণ্ড তীর্থধামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীশ্রী জ্বালামুখি কালী বিগ্রহের দেবোত্তর সম্পত্তি জাল জালিয়াতির মাধ্যমে দখলের চেষ্টা ও সেবায়েতদের ওপর হামলা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চন্দ্রনাথ ধাম রক্ষা পরিষদ এবং বাড়বকুণ্ড তীর্থধাম উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও পুন্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব দিদারুল আলম দিদারের বিরুদ্ধে বাড়বকুণ্ড তীর্থধামের সেবায়েতদের ওপর হামলা এবং দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েতদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ, দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও বেদখলমুক্ত করার জন্য খসড়া আইনের বিষয়ে হিন্দু সংগঠনের প্রস্তাবিত সংশোধনীসমূহ যুক্ত করে অবিলম্বে আইন পাশ ও কার্যকর, সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির পক্ষ থেকে ডাকাত শহীদ গংদের বরাবরে বেআইনিভাবে প্রদত্ত দেবোত্তর সম্পত্তির বন্দোবস্তি বাতিল ও উচ্ছেদ, সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির পক্ষ থেকে স্থানীয় হিন্দু জনসাধারণ ও সনাতনী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সমন্বয় করে দেবোত্তর সম্পত্তির এলাকা সুচিহ্নিত করে অবিলম্বে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ, অবাধ যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ ও বেদখলীয় সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, স্রাইন কমিটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে যাবতীয় হিসাব নিকাশ ও কর্মকান্ড সনাতনী জনসম্মুখে প্রকাশ, সীতাকুণ্ডের শ্রীশ্রী চন্দ্রনাথ ধাম ও বাড়বকুণ্ড তীর্থ ধামকে জাতীয় তীর্থস্থান ঘোষণা করে সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। উভয় ধামের সম্পত্তিগুলো রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে। যেসব সম্পত্তি বেদখল হয়েছে সেগুলো পুনরুদ্ধার এবং যেসব জায়গার ভুয়া কাগজপত্র বাতিলের ব্যবস্থা করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রীশ্রী চন্দ্রনাথ ধাম নিয়ে বিভিন্ন উস্কানিমূলক সাম্প্রদায়িক প্রচারণা বন্ধ এবং এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া যারা বিভিন্নভাবে সনাতন ধর্ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটুক্তি করে বা প্রচারণা চালায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সারাদেশে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের বলি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং যারা কারাগারে আছে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

এছাড়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পীঠস্থান বাড়বকুণ্ড তীর্থধামে স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন মঠ ও মিশনের প্রধানদের সমন্বয়ে চন্দ্রনাথধামের আধ্যাত্মিক মান সুনিশ্চিতকল্পে একটি যৌথ সেল গঠন করতে হবে ও মোহন্ত নিয়োগ সুনিশ্চিত, সীতাকুণ্ডের লবণাক্ষ ও কুমারীকুণ্ডের দেবোত্তর সম্পত্তি খাস বাতিল করে পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

১০ দফা দাবি আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন এবং সেই আন্দোলন সারাদেশে ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী করার ঘোষণা দেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছে তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কটের দাবি তোলা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ গভীর রাতে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডের বাড়ববানল মন্দিরে রাতের আঁধারে বিগ্রহ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তারা অগ্নিকুণ্ডসহ পাঁচটি মন্দিরে বিগ্রহ ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনায় মন্দিরের সেবায়েত কুমারী স্মৃতিলতা ভারতী বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, দুর্বৃত্তরা পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত হাজার বছরের প্রাচীন এ ধর্মীয় তীর্থপীঠে হামলা চালিয়ে অগ্নিকুণ্ডে থাকা দুটি শিবের বিগ্রহ, হনুমান মন্দিরের বিগ্রহ, ত্রিনাথ মন্দিরে থাকা ত্রিনাথ ঠাকুরের বিগ্রহ, অন্নপূর্ণা ও জগন্নাথ মন্দিরে থাকা বিগ্রহগুলো ভাঙচুর করেছে।

চন্দ্রনাথ মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির কতিপয় নেতৃবৃন্দের যোগসাজশে ও এক শ্রেণীর প্রভাবশালী মহল ভুয়া লিজ নিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের প্রায় ৩ হাজার একরের মতো ভূমি দখল হয়েছে চট্টগ্রাম ইসকন পুন্ডরিক ধাম অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী ফোনে আলাপকালে অভিযোগ করেন। 

তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন যে বাড়বকুন্ড তীর্থক্ষেত্রের ১৮ একর ভূমির মধ্যে ইতিপূর্বে ১০ একর ভূমি বেদখল হয়েছিল। নতুন করে আরও দেড় একর ভূমি দখলের পায়তারা চলছে ।